সারাদেশ

অষ্টগ্রামে ইট ভাটার শ্রমিক রফিকুল কে ইতালি পাঠানোর নাম করে ১৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে বিক্রির অভিযোগে ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলন

 

‎বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
‎উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার রফিকুল ইসলাম (৩৬)। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা নেওয়ার পর তাকে লিবিয়ায় পাঠিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই এলাকার এক পরিবারের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন জিম্মিদশা, অমানবিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে থেকে দেশে ফিরে এখন জড়িতদের বিচার দাবি করছেন তিনি। ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম অষ্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের নিয়ে আজ রবিবার সকালে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনে এ সকল অভিযোগ করেন। তিনি তার সাথে এ ধরনের ঘটনার বিচার দাবি করেন।

‎ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলামের বাড়ি উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের পশ্চিম সাভিয়ানগর দক্ষিণপাড়া গ্রামে। তার অভিযোগ, একই গ্রামের আবুল হোসেন (৬২), তার স্ত্রী আম্বিয়া বেগম (৫০), বড় ছেলে কাদির মিয়া, ছোট ছেলে আকাঈদ মিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতালিতে পাঠানোর নামে প্রতারণা, মানবপাচার ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

‎রফিকুল জানান, তিনি ও তার ছোট ভাই স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি বাড়িতে গবাদিপশুর দেখাশোনা করতেন। অভিযুক্তরা আত্মীয় হওয়ায় তাদের প্রতি তার আস্থা ছিল। তারা নিয়মিত ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখান। পরে ২০ লাখ টাকার দাবি করলেও আলোচনার মাধ্যমে ১৮ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। শর্ত অনুযায়ী ৯ লাখ টাকা আগে এবং বাকি ৯ লাখ ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল।

‎তিনি বলেন, পাসপোর্ট নেওয়ার পর তাকে ঢাকায় নিয়ে ১৭ দিন বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে ইতালিতে নয়, অন্য উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।

‎রফিকুলের ভাষ্য, লিবিয়ায় পৌঁছানোর কিছুদিন পর তাকে মরুভূমির একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা তাকে মারধর করে এবং পরিবারের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনার কথা জানায়। একই সঙ্গে বলা হয়, তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

‎তিনি আরও জানান, প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ দিন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকির মধ্যে দিন কাটাতে হয়। একপর্যায়ে পালানোর চেষ্টা করলে লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হন। পরে চিকিৎসা শেষে তাকে একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়।

‎রফিকুল জানান, শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় স্থানীয় এক আইনজীবীর মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। বিদেশে থাকাকালে অভিযুক্তরা ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আরও টাকা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‎তিনি বলেন, দেশে ফেরার পরও দীর্ঘদিন অভিযোগ করতে সাহস পাননি। কারণ বিদেশে থাকা অভিযুক্ত আকাঈদ মিয়া তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাতেন। এমনকি বিষয়টি প্রকাশ করলে গুম করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

‎রফিকুল ইসলাম বলেন, আত্মীয়দের বিশ্বাস করে নিজের জীবন তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই, যাতে আর কেউ এ ধরনের প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার না হন।

‎এ ঘটনায় রফিকুলের স্ত্রী ডলি সুলতানা পুনম অষ্টগ্রাম থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে অভিযুক্তরা ১৮ লাখ টাকা নেন। পরে রফিকুলকে লিবিয়ায় নিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারকে আরও প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

‎অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশের চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্তরা তাতে সাড়া দেননি। বরং বিভিন্ন সময়ে বাদীপক্ষকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

‎অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া ব্যাংক লেনদেনের কাগজপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ৪ লাখ টাকা, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর আরও ৪ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি সবুজা বেগম নামে একটি হিসাবে ৭ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এসব লেনদেনের নথি অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে বলে পরিবারের দাবি।

‎দেওঘর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. বাবুল আহমেদ বলেন, রফিকুল অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ। বিদেশ যাওয়ার আগে বিষয়টি কাউকে জানাননি। দেশে ফেরার পর তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল।

‎রফিকুলের বন্ধু আহমেদ রেজা জানান, দেশে ফিরে রফিকুলের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনে তিনি একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। পরে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ ও হুমকির মুখে সেটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।

‎অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান বলেন, “একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে অন্য পথে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে তিনি মানবপাচারকারী ও মাফিয়া চক্রের কবলে পড়েন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বার্তা প্রেরক: বিজয় কর রতন, মিটামইন, কিশোরগঞ্জ।

Share

আরও খবর

রাজাপুরের “বাউল ছালমা” সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক নিরলস নারী

নান্দাইলের খারুয়া বাজারে চার দিন পর ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার

কিশোরগঞ্জের সাবেক ডিআইজি ডিবি হারুন সহ স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ টি মামলা দায়ের। জমির টাকা না দিয়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট নির্মানের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের

ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক কবি ও সাহিত্যিক পরিষদের গুণীজন সংবর্ধনা ও অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান

ঝালকাঠী’র দেউরী গ্রামে ভয়াবহ নদী ভাঙন: দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিলীন হবে পুরো এলাকা — মানববন্ধনে এলাকাবাসীর আর্তনাদ

হ্নীলায় পানিবন্দি মানুষের পাশে কোস্ট ফাউন্ডেশন, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

Sponsered content