সারাদেশ

কিশোরগঞ্জের সাবেক ডিআইজি ডিবি হারুন সহ স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ টি মামলা দায়ের। জমির টাকা না দিয়ে প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট নির্মানের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের

 

 

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:- কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে গরিব মানুষের প্রায় ১২১ বিঘা জমি নিজের আয়ত্তে নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ গড়ে তোলেন প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট। রিসোর্টের জন্য নেওয়া ওই জমির মূল্য প্রায় ৭ কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু জমির মালিকরা এ টাকা পাননি। তাদের চরমভাবে ঠকানো হয়েছে। এর মধ্যে রিসোর্টের স্থাপনা রয়েছে প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর। প্রভাব খাটিয়ে এ জমির মালিককে মাত্র ১ লাখ টাকা ধরিয়ে দিয়ে জমির দলিল করে নেওয়া হয়। সম্পতি রিসোর্ট খানি কিশোরগঞ্জের আমেরিকা প্রবাসী শাহীনূর খান নামে এক ব্যক্তি ১৫ বছরের লিজ নিয়েছেন বলে তিনি জানান। তথ্য অনুসন্ধানে হারুনের ক্ষমতার তাণ্ডবে অবৈধ সম্পদ ও অবিশ্বাস্য দলিলকাণ্ডের বিষয়টি বেরিয়ে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যে কজন দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন তাদের মধ্যে তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদের পরেই ছিল ডিআইজি হারুন অর রশীদের প্রভাব । সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক বলয় ও প্রভাব তৈরি করে বেনজীরের মতো হারুনও ধীরে ধীরে দুর্নীতির ডালপালা বিস্তার করেন। রাষ্ট্রীয় একটি বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করেছেন মানুষের অধিকার হরণ আর দুর্নীতি-লোপাটের কাজে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ থাকায় হারুন হয়ে পড়েন বেসামাল। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ ছাড়েন তিনি। তদন্ত দপ্তরগুলোর কাছে অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি ও পাচারের টাকায় তিনি তার স্ত্রী-সন্তানকে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ‘সেটেল’ করে রাখেন। পদপদবির ক্ষমতা বিস্তার করে দেশেও গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদ। দুদক থেকে হারুন, তার স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলাও হয়েছে। সেসব মামলার তদন্ত চলমান। অনুসন্ধানে কিশোরগঞ্জে হারুনের শতকোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। এনবিআর ও দুদকের তদন্ত এখনো চলমান। হারুন কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ২০১৮ সালে শুরু করেন প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট তৈরির কাজ। ২০২০ সালে উদ্বোধন করেন। কাগজে-কলমে রিসোর্টের মালিকানা দেখানো হয় হারুনের মা, এক ভাই ও স্ত্রীকে। প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডের চেয়ারম্যান করা হয় হারুনের মা জহুরা খাতুনকে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয় তার ভাই এবিএম শাহরিয়ারকে। তার মা একজন গৃহিণী। ভাই শাহরিয়ার ২০১৯ সালে হলিফ্যামিলি হাসপাতাল অ্যান্ড কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ওই সময়ে ৩৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে রিসোর্ট করার মতো অবস্থানে তিনি ছিলেনও না। ফলে রিসোর্টের সমুদয় অর্থের উৎস নিয়ে তখনো অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়। অন্যদিকে, এই রিসোর্ট তৈরির জন্য হারুন তার প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় অসংখ্য নিরীহ মানুষের জমি নেন। কিন্তু কোনো জমির মালিককেই ন্যায্যমূল্য দেননি। কেউ তখন ভয়ে এ নিয়ে মুখ খুলতেও সাহস পাননি। তবে অনেকেই বলেছেন, পদে থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে রিসোর্ট গড়ে তোলার ঘটনা দেশে নজিরবিহীন। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, হারুন মিঠামইন উপজেলার সদর ইউনিয়ন ও আশপাশে হাওড় এলাকায় প্রায় ৪০ একর বা ১২১ বিঘা জমি নিজের আয়ত্তে নেন। নকশা অনুযায়ী রিসোর্টের মূল স্থাপনা রয়েছে প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর। এই জমির দলিলমূল্যে চোখ আটকে যায়। মাত্র ১ লাখ টাকায় আড়াই বিঘা জমি! হারুন যে ১২ জন স্থানীয় বাসিন্দার জমি নিয়েছেন তাদের একজন এ প্রতিনিধিকে জানান, আমরা তখন ভয়ে কিছু বলতে সাহস পাইনি। হাতেগোনা কয়টা টাকা দিয়ে আমাদের বিঘার পর বিঘা জমি নিয়ে গেছেন (হারুন) তিনি। বাস্তবে ওই জমির বাজারমূল্য বহুগুণ বেশি। কিন্তু পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের আত্মীয় পরিচয় থাকায় কোনো জমির মালিক তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস পাননি। মিঠামইন উপজেলার সদর ইউনিয়নের গিরিশপুর গ্রামের বাসিন্দা দিলীপ কুমার বণিক জানান, দরদাম ঠিক না করেই তার এক একর দশ শতাংশ জমি নিয়েছেন হারুন। তাকে এ জমি বাবদ মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাজারমূল্য হিসাবে তাকে দেওয়ার কথা কম হলেও ২০ লাখ টাকা। তিনি বলেন, ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা আমাকেই ঠকানো হয়েছে। আমার মতো আরও ১২ জন আছেন এভাবে সামান্য কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাদের জমিও নিয়েছেন। এছাড়াও হোসেনপুর গ্রামের মানিক মিয়ার অনেক জমি সাবেক এই ডিআইজি হারুন দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের (সরকারি) হিসাবে মিঠামইনে গড়ে তোলা প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডে হারুনের বিনিয়োগ ৩৫ কোটি টাকা। তদন্ত শেষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাস্তবে ওই রিসোর্টে বিনিয়োগ প্রায় ৫০ কোটি টাকা হবে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা। এদিকে, ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুদক থেকে হারুন, তার ভাই ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় ৪১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করা হয়। অভিযোগ থেকে দেখা যায়, হারুনের বিরুদ্ধে ১৭ কোটি, তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১২ কোটি ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয় মামলায়। তদন্তে দুর্নীতির অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানান দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে মামলা করা হয়েছে। তদন্তকালে সব স্থাবর-অস্থাবর ও অবৈধ সম্পদের তথ্য বের হবে। তদন্তে হারুনের মায়ের নামেও ২ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে। বাস্তবে এই অঙ্ক আরও বেশি হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক জয়নুল আবেদীন জানান, সাবেক ডিআইজি হারুনের বিদেশে সম্পদের বিষয়ে কাজ করছে বিএফআইইউ। দুদকের তদন্ত শেষে হারুনসহ তার পরিবারের অপরাপর সদস্যদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে সাবেক ও বর্তমান মিলে যে ৯৫২ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি ডিবির তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ। সারা দেশে তার বিরুদ্ধে ১৭১টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

বার্তা প্রেরক:
বিজয় কর রতন,
মিটামইন, কিশোরগঞ্জ।

Share

আরও খবর

৩ বছরেও প্রথম সেমিস্টারের গন্ডি পেরোতে পারেনি ববি ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক তামিম

গাইবান্ধায় রামকে অবমাননার প্রতিবাদে মধ্যরাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতনী শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল

অষ্টগ্রামে ইট ভাটার শ্রমিক রফিকুল কে ইতালি পাঠানোর নাম করে ১৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে বিক্রির অভিযোগে ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলন

ঝালকাঠী’র প্রতিবন্ধী বিএনপি কর্মী এমরাজকে অটোরিকশা উপহার দিলেন এ্যাড. শাহাদাৎ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের নতুন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সিরাজিস সাদিক

দেবিদ্বারে প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে প্রধান শিক্ষককে ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ গণপিটুনির পর উধাও

Sponsered content

নরসিংদী সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের পৌলানপুরে টেক্সটাইল শ্রমিক কর্তৃক কিশোরীকে পাশবিক নির্যাতন: সহযোগী গ্রেফতার, মূলহোতা পলাতক

অর্থাভাবে ভর্তি হতে না পারা শিক্ষার্থীর পাশে ববি ছাত্রদল নেতা সাব্বির

লুক নয়, গল্পেই মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন ফারজানা এ্যানি

হযরত আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) : ইলম ও যুহদের মাকাম-মর্তবায় এ কালের মানুষের জন্যে উপমা হয়ে থাকবেন মাওলানা মুহাম্মদ সিদ্দীকুর রহমান চৌধুরী

ববি শিক্ষার্থী সুজয়ের ‎বিরুদ্ধে নারী নিপীড়নের অভিযোগ- শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও শাস্তি দাবি

গাইবান্ধায় রামকে অবমাননার প্রতিবাদে মধ্যরাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতনী শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল