সারাদেশ

অষ্টগ্রাম হাবেলি বাড়িতে ১৯১ বছরের ঐতিহ্যের মহররম: আজ ‘নিশান গাস্ত’, আজ সমাপ্তি

 

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:- কারবালার শোক, ত্যাগ, সত্য ও ন্যায়ের আদর্শকে ধারণ করে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক হাবেলি বাড়িতে পালিত হচ্ছে ১৯১ বছরের ঐতিহ্যবাহী মহররম। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে নিজস্ব রীতি, আচার ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এখানে পালিত হয়ে আসছে পবিত্র মহররমের শোকানুষ্ঠান, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মহররম পালনের ধরন থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম ও স্বতন্ত্র। মহররম কেবল শোকের মাস নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার এক অনন্য শিক্ষা। কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগের স্মরণে অষ্টগ্রামের হোসাইনী ভক্তরা প্রতি বছর ১০ দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে এই শোকানুষ্ঠান পালন করে থাকেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ভাটির অলী হিসেবে খ্যাত এবং নয় কোষা জমিদারী ত্যাগকারী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর সৈয়দ আবদুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.), যিনি স্থানীয়ভাবে সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব নামে পরিচিত, ১৮৩৫ সালে প্রথম অষ্টগ্রামের হাবেলি বাড়িতে এ ধারার মহররম পালনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই নিয়ম, একই আবেগ ও একই আদর্শকে ধারণ করে এ অঞ্চলে মহররম পালিত হয়ে আসছে। সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মাওলানা সৈয়দ আবদুল হেকীম আল-হোসাইনী (রহ.) এই ঐতিহ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ আল-হোসাইনী (রহ.) দীর্ঘদিন এ আয়োজন পরিচালনা করেন। বর্তমানে তাঁর উত্তরসূরি সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্স এলাকার হাজারো হোসাইনী ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অষ্টগ্রামের হাবেলি বাড়িতে প্রচলিত এই মহররম পালনের ধারা এখন কিশোরগঞ্জের বৌলাই সাহেব বাড়ি, হোসেনপুর, কটিয়াদী ও ভৈরব ছাড়াও নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও নাসিরনগর, হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক সুলতানশী হাবেলী, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অঞ্চলেও সুন্নি অনুসারীরা একই আদর্শ ও নিয়ম অনুসরণ করে মহররম পালন করে থাকেন। মহররমের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ১০ দিনের কঠোর সংযম ও আত্মশুদ্ধির পর্ব। এ সময় হোসাইনী ভক্তরা স্বেচ্ছায় আরাম-আয়েশ বর্জন করে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন। অনেকেই টানা ১০ দিন রোজা রাখেন। ঘরের খাট, পালং বা আরামদায়ক শয্যা ছেড়ে মাটিতে ঘুমান। সাধারণ পোশাক পরিধান, খালি মাথায় ও খালি পায়ে চলাফেরা এবং সংযমী খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে তারা কারবালার শোক ও ত্যাগের স্মৃতি ধারণ করেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর হোসাইনী মোকামে কারবালার ইতিহাস ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে পরিবেশিত হয় জারি গান ও শোকগাথা। সকাল থেকে আসর পর্যন্ত চলে কারবালার প্রতীকী স্মারক ‘তাজিয়া’ নির্মাণের কাজ। স্থানীয় শিল্পী ও ভক্তরা নিষ্ঠার সঙ্গে এসব তাজিয়া তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে শোকমিছিলে প্রদর্শন করা হয়। আসর নামাজের পর শুরু হয় মাতম, মার্সিয়া ও শোকগাথা পরিবেশনের আয়োজন। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। মাগরিবের আজানের পর ফাতিহা পাঠ, তাবাররক বিতরণ এবং ইফতারের মাধ্যমে প্রতিদিনের কর্মসূচি শেষ হয়। স্থানীয় হোসাইনী ভক্ত মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই মহররমের আয়োজন দেখে আসছি। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কারবালার শোক ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের শিক্ষা আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। তাই প্রতি বছর আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে এ শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। অংশগ্রহণকারী যুবক শাহরিয়ার হোসাইন বলেন, “মহররম আমাদের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও আদর্শিক শিক্ষার একটি মাধ্যম। ১০ দিনের সংযম, শোকগাথা ও কারবালার ইতিহাস আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।” প্রবীণ বাসিন্দা হাফেজ মো. আবু তাহের বলেন, “অষ্টগ্রামের হাবেলি বাড়ির এই মহররম দেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে একই নিয়মে এ আয়োজন চলে আসছে। এটি আমাদের এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।” হোসাইনী ভক্ত সৈয়দ মেহেদী হাসান বলেন, “মহররমের প্রতিটি আয়োজনের মধ্যেই কারবালার স্মৃতি ও শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরতে চাই, যাতে তারা সত্য, ন্যায় ও মানবতার আদর্শ ধারণ করতে পারে।” স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, “আজকের নিশান গাস্ত ও আজ তাজিয়া মিছিলকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আলাদা আবেগ কাজ করে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এলাকার শত বছরের ঐতিহ্যেরও একটি বড় অংশ।” অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ এই আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ দুই দিনে এলাকার সব হোসাইনী ভক্ত একত্রিত হয়ে শোকমিছিল বের করেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘গাস্ত’ বা ‘চক্কর’ নামে পরিচিত। এই আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সহযোগিতায় তিনি নিজেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তিনি জানান, আজ ১০ মহররম দুপুর ১২টা ১ মিনিটে অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক হাবেলি বাড়ি আল-হোসাইনী দরবার শরীফ থেকে ঐতিহ্যবাহী ‘নিশান গাস্ত’ বের হয়েছে। শত শত ভক্ত কালো পতাকা, ধর্মীয় প্রতীক ও শোকের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে মিছিলে অংশ নেন। পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় এক শোকাবহ কিন্তু ভাবগম্ভীর পরিবেশ। আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরার দিনে অনুষ্ঠিত হবে সবচেয়ে বড় তাজিয়া মিছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্মিত তাজিয়াগুলো নিয়ে হাজারো মানুষ শোকমিছিলে অংশ নেবেন। মিছিল শেষে মধ্য অষ্টগ্রামের স্থানীয় কারবালা ময়দানে তাজিয়াগুলো সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হবে। এর মধ্য দিয়েই সমাপ্ত হবে ১০ দিনব্যাপী ১৯১ বছরের ঐতিহ্যবাহী মহররমের শোকানুষ্ঠান। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং কারবালার মহান আত্মত্যাগ, সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রাম এবং মানবতার বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে অষ্টগ্রামের হাবেলি বাড়ি সেই ঐতিহ্য ও আদর্শকে লালন করে আসছে, যা আজও হাজারো মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। ”

বার্তা প্রেরক:
বিজয় কর রতন,
মিটামইন, কিশোরগঞ্জ।

Share

আরও খবর

গাইবান্ধায় রামকে অবমাননার প্রতিবাদে মধ্যরাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতনী শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল

বাকেরগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের ব্যাগে মিলল ছাত্র-ছাত্রীদের মিড-ডে খাবার ২৪ টি ডিম ২২ টি রুটি

ভারত-বাংলাদেশের সুপরিচিত কবি, সম্পাদিকা, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কণ্ঠশিল্পী ও ছড়াকার মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প : নীরব রাতের তারা

ববি কর্মকর্তার ভুয়া পিএইচডির সংবাদ প্রকাশের পর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

মিঠামইনে উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে মানববন্ধন স্মারকলিপি পেশ

‎সুন্দরবনে কোস্ট গার্ড স্টেশনে দুর্বৃত্তদের পরিকল্পিত হামলা: বনদস্যু দমনে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা

Sponsered content