ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ
মোংলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই বছরের শিশু ইফা আক্তারের মৃত্যু হয়েছে, যা স্থানীয় স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মোংলা পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সিগনাল টাওয়ার এলাকার বাসিন্দা শাকিল তালুকদারের দুই বছর বয়সী শিশুকন্যা ইফা আক্তার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। গত ১৮ জুলাই শনিবার দুপুরে প্রচণ্ড জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে শিশুটিকে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে প্রাথমিক পরীক্ষায় তার শরীরে ডেঙ্গুর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে একই দিন সন্ধ্যায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় রবিবার ভোরে শিশুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এই অকাল মৃত্যু স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং পৌর এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশক নিধনে যথাযথ পদক্ষেপের অভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে। মূলত, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবনে ব্যর্থতা এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ এবং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সিগনাল টাওয়ার এলাকাসহ মোংলার বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও নর্দমার পানি মশা বংশবৃদ্ধির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিশু ইফার স্বজনদের দাবি, পৌর কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান না থাকায় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন যে, মশক নিধন কার্যক্রম কেবল লোক দেখানো এবং তা নিয়মিত পরিচালনা করা হয় না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা অন্যান্য রোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও ওষুধের সংকটের কারণে তারা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের মতে, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকে যে জরুরি ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল, তা স্থানীয় পর্যায়ে নিশ্চিত করতে পারলে হয়তো শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হতো। প্রতিদিন যেভাবে নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তাতে এই এলাকাটি এখন একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিন জানান, রবিবার সকাল পর্যন্ত নতুন করে আরও তিনজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যার ফলে গত ২৪ ঘণ্টায় মোট সাতজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসছে, যা নির্দেশ করে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, হাসপাতালে রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল সংকটের কারণে রোগীদের যথাযথ সেবা প্রদান করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে মশক নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো কার্যকর প্রভাব মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার মতো কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো উদ্যোগ এখনো গৃহীত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি মোংলার স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান ভঙ্গুর কাঠামোর একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি এখনই ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মশা নিধনে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন ডেঙ্গু আতঙ্কে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষমতার ওপর। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে হলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং পৌর কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কেবল দায়সারা প্রচারণার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত মশক নিধন কর্মসূচি পরিচালনা এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট ও প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
মোঃ শাহাদাত ভূঁইয়া
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়
পুরানা পল্টন, ঢাকা
মোবাইল: 01711928746
ই-মেইল: bangladeshsangbad2023@gmail.com
Copyright © 2026 বাংলাদেশ সংবাদ. All rights reserved.